বৃহৎ বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে ‘পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে’:

0
28
বৃহৎ বিদ্যুৎ সংকট

বাংলাদেশে বৃহৎ বিদ্যুৎ সংকট মেটাতে রূপপুর পারমাণবিক, রামপাল এবং পায়রার মতো বড় বড় বেশ কিছু জ্বালানি প্রকল্প শুরু করেছিল সরকার। তখন আশা করা হয়েছিল, এসব প্রকল্প চালু হয়ে গেলে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি আর থাকবে না।

কিন্তু এখন অব্যাহত বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে এসব প্রকল্প সরকারের জন্য নতুন জটিলতা তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

কারণ ডলার সংকটের কারণে একদিকে এসব কেন্দ্রের কাঁচামাল আমদানি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ঠিক সময়ে কাঁচামাল আনতে না পারলে কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রাখতে হবে।

অন্যদিকে তেলের চড়া মূল্যের কারণে ভাড়ায় চালিত কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করা নিয়েও জটিলতা রয়েছে।

ফলে গরমকাল আসতে শুরু করায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক রাখা যাবে, তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

তবে সরকার বলছে, তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।

বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বাংলাদেশের এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে ২৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। সেই সঙ্গে আমদানি হয় এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট।

কিন্তু বাংলাদেশে গরমের সময় পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ চাহিদা ওঠে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম কেন্দ্র রয়েছে ১৫৪টি। যার মধ্যে বেশিরভাগই ভাড়ায় চালিত ডিজেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

তবে গত বছর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে গেলে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে ডিজেল চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয়। ফলে বহু বছর পরে গত বছর গরমের সময়েও ব্যাপক হারে লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হয় দেশটির বাসিন্দারা।

এমনকি বিরল হলেও এই বছর শীতের সময়েও লোডশেডিং করতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

বৃহৎ বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে কেন্দ্রগুলোর কাঁচামাল নিয়ে আশঙ্কা

ডলার সংকটে ঋণপত্র খুলতে না পারায় কয়লা আমদানি না হওয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র রামপালে উৎপাদন একমাস বন্ধ রাখা হয়।

জুন মাস থেকে রামপালের দ্বিতীয় ইউনিটের পুরো দমে উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এই কেন্দ্রের দুটি ইউনিট চালু রাখতে যে পরিমাণ কয়লার প্রয়োজন রয়েছে, সেটার সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন কেন্দ্রটির কর্মকর্তারাই।

বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) উপ-মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম শনিবার বিবিসি বাংলার সানজানা চৌধুরীকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমরা নিশ্চিত না কতদিন আমরা উৎপাদন করতে পারবো। চেষ্টা থাকবে কয়লার সরবরাহ যাতে নিরবচ্ছিন্ন থাকে। যতদিন পর্যন্ত কয়লার সরবরাহ থাকবে ততদিন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে, নাহলে বন্ধ থাকবে। দেখা যাক কি হয়।”

সর্বশেষ চালানে যে পরিমাণ কয়লা এসেছে, তাতে এই কেন্দ্রটি আর মাত্র ১১দিন চালানো যাবে। একটি কেন্দ্র চালু রাখতে হলেও প্রতি ১৫দিন পর পর ৫০ হাজার টনের বেশি কয়লার প্রয়োজন এই কেন্দ্রের।

কিন্তু যে জটিলতার মধ্য দিয়ে একমাস পরে কয়লা আমদানি করতে হয়েছে, সামনের দিনগুলোয় সেটা সহজ হবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে।

আরেকটি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র পায়রা ২০২০ সাল থেকে যে পরিমাণ কয়লা আমদানি করেছে, তার মধ্যে সর্বশেষ জানুয়ারি মাস পর্যন্ত চীনের কোম্পানির কাছে অনাদায়ী বকেয়া পড়েছে প্রায় সাত কোটি ডলার।

সংস্থাটি জানিয়েছে, বকেয়া পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তারা নতুন করে কয়লা আমদানিতে অর্থায়ন করবে না।
এসব জটিলতায় এই বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে এই কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ কয়লা মজুদ রয়েছে, তাতে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কেন্দ্রটির উৎপাদন চলবে। এর মধ্যে নতুন কয়লা আমদানি করা না গেলে সেটিরও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে।

কয়লা কিনতে ডলারের বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কিন্তু কাঁচামাল নিয়ে এরকম টানাপড়েনে উৎপাদন কতদিন স্বাভাবিক রাখা যাবে, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, আগামী দুই বছর বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলোয় যে কয়লা ব্যবহার করা হবে, সেটা আমদানি করতে ব্যয় হবে অন্তত পাঁচ বিলিয়ন ডলার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’একটা সময় আমরা দেশীয় গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরি করা হতো। তখন দেশীয় গ্যাস আমরা কিনেছি তিন ডলারে কিন্তু সেটা ধীরে ধীরে অনেক কমে গেছে। সেটার বদলে এখন বিশ্ববাজার থেকে এলএনজি আনতে হচ্ছে ১২ ডলারে। স্পট মার্কেট থেকে কিনলে সেটা পড়ে ২০ ডলারের বেশি। এখানেও কিন্তু অনেক ডলার চলে যাচ্ছে।‘’

সংকট সামাল দিতে রামপাল, পায়রা ছাড়াও আরও কয়েকটি কয়লা ভিত্তিক বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কক্সবাজারের মাতারবাড়ি আর চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আরও দুটি বড় বিদ্যুৎ আকারের বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির কাজ শেষের দিকে রয়েছে। বরিশালের ও ঢাকায় মাঝারি আকারের দুটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ চলছে।

এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হয়েছে বিদেশ থেকে আমদানি করা কয়লার ওপর ভিত্তি করে।

‘’কয়লা তো এখন বিপুল আকারে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। সর্বশেষ আমরা রামপাল ও পায়রার মতো কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করেছি। আরও এক দুই বছরের মধ্যে আরও দুটি অ্যাড হবে। এগুলোর জন্য কয়লার বিশাল সাপ্লাই লাগবে। পুরোটাই আমদানি করতে হবে। এগুলোর জন্যও কিন্তু অনেক ডলার লাগবে। ডলার ক্রাইসিস এরকম থাকলে সেটা কতটা পারা যাবে, আমি জানি না,’’ বলছেন ড. বদরুল ইমাম।

আবার কয়লা আমদানি করতে না পারলেও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রাখতে হলেও সরকারকে বিপুল অংকের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে।

ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যে কয়লা ব্যবহার করা হবে, সেটারও মূল্য বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রায়।

পাশাপাশি রূপপুর, রামপাল ও পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে নেয়া ঋণও পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশ, যদিও সেজন্য এখনো সময় আসেনি।

ডলার সংকটের কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন তৈরি নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছিল, কারণ সরকারি ব্যাংকও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিশ্চয়তা ছাড়া যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খুলতে রাজি হয়নি। পরে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে সেই সমস্যার সমাধান করা হয়।

যে ডলার সংকটের কারণ দেখিয়ে গতবছর গ্রীষ্ম মৌসুমে ডিজেল চালিত কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে পরিস্থিতির এখনো খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। খুব তাড়াতাড়ি পরিবর্তনের লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।

সেই সময় বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, ডিজেল চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে সরকার ডিজেলের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করলেও তা খুব বেশি কমেনি। কারণ লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যক্তিগত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটরে ডিজেল ব্যবহার করতে শুরু করেন।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই বছরেও সরকারকে সেই নীতিরই অনুসরণ করতে হতে পারে। সেটা হলে বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।

‘’আমাদের সত্যিই খুব সতর্ক হওয়া দরকার। না হলে সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, ‘’বলছেন ড. বদরুল ইমাম।

ড. বদরুল ইমাম আশঙ্কা করছেন, বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্র থেকে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে উত্তোলন করা হচ্ছে। সেখানে গ্যাসের উৎপাদন কমতে শুরু করলে সেটা সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

সমস্যার সমাধান কতদূরে?

বিদ্যুৎ খাতের এই সংকটকে শুধুমাত্র এই খাতের সমস্যা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির একটা অংশ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এবং অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’এটা শুধু যে বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ, সেটা ভাবলে ভুল হবে। পেমেন্টে, ব্যক্তিখাতে, কমোডিটি ইমপোর্টে এর চাপ বিশাল ভাগে দেখা যাচ্ছে। এলসি ওপেন করা যাচ্ছে না। অনেক এলসির মাল চলে আসছে, কিন্তু এলসির দাম পরিশোধ করা যাচ্ছে না। ফলে আমাদের আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।‘’

এসব কারণে বাণিজ্যে যে বিশেষ ঋণ সুবিধা পেতো বাংলাদেশ, সেটাও কমে আসছে।

বাংলাদেশের সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আভাস দেয়া হয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ পাওয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ ডলার সংকট অনেকটা কমে আসছে।

কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি এই সমস্যার কোন সমাধান হবে বলে ড. আহসান এইচ মনসুর দেখতে পাচ্ছেন না।

‘’আমরা যেটা দেখছি, সিচুয়েশনটা আরেকটু বিস্তৃত হচ্ছে। সেটার আশু সমাধান আমরা কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না। সেটা ছয়মাস বা এক বছরেও শেষ হবে কিনা, সেই নিশ্চয়তা নেই,’’ তিনি বলছেন।

তিনি বলছেন, ‘’সংকট সামলাতে আমাদের নীতিগত বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল। কিন্তু সেখানে এখনো বড় ধরনের কোন পরিবর্তন নেয়া হয়নি। ২০২০ সালে যা ছিল, এখনো অনেকটা তাই আছে। সরকার মিতব্যয়ের কথা বলছে, কিন্তু বাজেটে কাটছাঁটের মতো সেরকম কোন বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।‘’

‘’এই পরিস্থিতি থেকে কীভাবে আমরা বের হতো, সেরকম কোন নীতিমালা বা কৌশলও নেই। সেরকম কোন পদক্ষেপ বা নেতৃত্বও আমরা দেখছি না। ফলে আমার এখন অনেকটা নোঙর বিহীন ভাসমান নৌকার মতো অবস্থায় আছি,’’ বলছেন ড. আহসান এইচ মনসুর।

বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করছেন, জ্বালানি খাতে সামনের দিনগুলোয় কতো খরচ আছে, ক্যাপাসিটি চার্জ হতো দিতে হবে, সেসব বিষয়েও পরিষ্কার কোন ধারণাও দেয়া হচ্ছে না সরকারের তরফ থেকে।