দৈনিক জনতা https://www.dainikjanata.com/2019/04/blog-post_421.html

প্রসঙ্গ: ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড : অস্তিত্বে আত্মপরিচয় সংকট

শুরুটা কোত্থেকে করা উচিত—এ নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করতে হচ্ছে। ভাবনার মধ্যে যে ছন্দপতন হয়েছে পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে, সেখান থেকে নিজের চারপাশ ভালো রাখা আজকাল এক প্রকার বিপরীতভাবে বেঁচে থাকার মতো কিছু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢেঁকি ছাঁটা চালের পিঠার সঙ্গে আমাদের যে একটা বিস্তর ব্যবধান হয়ে গেছে; আমরা তা বুঝতেই পারছি না। সেই স্বাদ সাধ্যের বাইরে চলে গেল, সীমারেখা ভেদ করে তার সঙ্গে আমাদের পার্থক্য আজ যেন যোজন যোজন মাইল। এখন তো সবকিছু কিনতেই পাওয়া যায়। সহজ জীবন। কার এত ঠ্যাকা পড়ে আছে এত কষ্ট করে চাল প্রসেস করে পিঠা বানানোর। চারপাশের ধার করা উপাদানেই তো সহজে হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। দরকার কি? কিইবা প্রয়োজন?
যে বীজে নতুন গাছ প্রাণ পাবে, বেড়ে উঠবে আপন শক্তিতে, আপন স্রোতেই, সেখানেই আজ বিষ মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে অধিক ফলনের আশায়। সময়ের ব্যবধানে সেখানে যে ফল আসবে, তাকে গোগ্রাসে গিলবে প্রজন্ম। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও পান করে যাবে সেই সুধা। এর পরের গল্প তো আরো করুণ, তাদের রোপণ করা বীজ কে উৎপাদন করবে আর পরের নতুন প্রজন্মই বা গ্রহণ করবে কি? প্রশ্নটি হয়তো সত্যি অবান্তর এ সময়ে। অযথাই দুশ্চিন্তা করে সময়কে কলুষিত করা। কিন্তু এ যে কালিমাখা মুখে আমার বেঁচে থাকা ব্যাহত হচ্ছে, তার জবাব আমি কার কাছে চাইব। জীবন তো যার যার, তার তার। কিন্তু আমার শৈশবের চেতনায় আমার যে শিক্ষা—‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’ অথবা ‘সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি’—এসব কি তাহলে ইতিহাস? অথবা যদি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতেই চাই, তাহলে আমার উপকরণগুলোয় কী কী থেকে যাচ্ছে এ বেঁচে থাকায়।
বলছি নিউইয়র্কের জ্যামাইকা এলাকার আমাজুরা হলে ৭ এপ্রিল মধ্যরাতে শেষ হওয়া ‘ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’-এর গল্প। বাংলাদেশ থেকে আগত অন্তত ২০ জন তারকা শিল্পীর উপস্থিতির এ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের সারাংশ। তাদের আমি দুই ভাগে ভাগ করব। এক কাতারে শিল্পী, আরেক কাতারে অতিথি শিল্পী। প্রথমেই যাই শিল্পীর কাতারে কারা ছিলেন। আমার কাছে শিল্পী শব্দের মানে বৃহৎ, যা দৈর্ঘ্যে পরিমাপ করা যায় না। বছরের পর বছর সাধনা করেই এ শব্দকে স্থায়িত্ব দান করতে হয়। এ কাতারে থাকলেন আকবর হোসেন পাঠান ফারুক, সুবর্ণা মুস্তাফা, জাহিদ হাসান, মেহের আফরোজ শাওন, মিশা সওদাগর ও তিশা। আর অতিথি শিল্পীর কাতারে যারা ছিলেন, তাদের অধিকাংশই অপরিচিত। এছাড়া কয়েকজন কিছু অংশে পরিচিত। যেমন সাজু খাদেম, প্রভা, ভাবনা, তাহসান, রিজিয়া পারভীন, আবু হেনা রনি, নাদিয়া, পিয়া বিপাশা, নিশাত সাওলা, নাভেদ আহমেদ, ইশরাত পায়েল, সজল, শিরীন শীলাসহ আরো অনেকেই, যাদের আমি সত্যিকার অর্থেই চিনি না।

প্রচণ্ড কষ্টের জায়গা থেকে বলছি, যারা শিল্পীর কাতারে আছেন বলে আমার কাছে মনে হয়, এ রকম একটা অস্তিত্ববিহীন অনুষ্ঠানে আসায় তাদের ব্যক্তিগত মর্যাদা অনেকখানি নিচে নামিয়ে দিয়েছে। আমি মনে করি, শিল্পীর একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে, আর তাকে কখনই ভেদ করা উচিত না, কেউ ভেদ করতে চাইলে করতেও দেয়া উচিত না। তাতে করে শিল্পীর যতটা না ক্ষতি হয়, তার থেকে বেশি ক্ষতি হয় তাদের অনুসরণকারীদের। কারণ তাদের অনুসরণকারীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। যাদের আইডল মনে করা হয়, তারাই যদি তাদের অবস্থানকে শক্ত না করতে পারেন, তাহলে নতুনরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়—শিল্পী মাথা উঁচু করে থাকে সূর্যের দিকে। এতে চোখ যদি গলেও যায়, কিছু যায়-আসে না। বেগুনি রশ্মি অথবা অতি বেগুনি রশ্মিও সেই মাথাকে কখনো নত করতে পারে না। জাতীয় পুরস্কার, একুশে পদক পাওয়ার পরও কীভাবে এসব শিল্পী এ রকম একটা অর্থহীন, উদ্ভট, অস্তিত্ববিহীন অনুষ্ঠানে এলেন, আমার মাথায় ধরে না।
জাতীয় সীমানা পেরিয়ে শিল্পী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা রপ্ত করবেন প্রতিটি মুহূর্তে। শিল্পী ক্রমেই উঠবে উপরে; সঙ্গে নিয়ে যাবে নিজের দেশকে। তা না করে এ শিল্পীরাই এলেন প্রশ্নবিদ্ধ এক ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে। যে অ্যাওয়ার্ড কানাল স্ট্রিট অথবা ব্রডওয়ের কোনো গিফট শপের দোকান থেকে ২০ ডলারে কিনে হাতে তুলে দেয়া হয়। আমার খুব বলতে ইচ্ছা করে এ শিল্পীদের যে, তাদের আরেকটু রিসার্চ করা উচিত ছিল। উচিত ছিল আমি যেখানে পা ফেলছি, তা আসলে কোথায়—সমুদ্রে নাকি নর্দমায়। তাহলে আমি কি ধরেই নেব এ শিল্পীদের আর কিছুই দেয়ার নেই। তাদের কি ফুরিয়েই গেছে দেয়ার, যা অবশিষ্ট ছিল? নাকি সত্যি সত্যিই কিছুই বাকি নেই আর।
৮৫০ আসনবিশিষ্ট হলে তাহসানের মতো আইডেনটিটি ক্রাইসিসে ভোগা শিল্পী যখন গান করছিলেন, তখন তার সামনে দর্শক ছিল শ দেড়েক (সূত্র: প্রথম আলো)। লিওনের গানে কানায় কানায় পূর্ণ। তাহলে বুঝতেই হবে এসব শিল্পীর আসলে অবস্থানটা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। জাহিদ হাসানের ভাঁড়ামি আরো প্র্যাকটিস করা উচিত। ভাঁড় যে রসের উপাদান সৃষ্টি করে, তা জমে যে গাওয়া মিষ্টি ঘিয়ে পরিণত হয়, সেটা সময়ের এ সহজ নষ্টামিতে তিনি ভুলেই গেছেন। মানুষ যে এখন পেছনে গালাগালি করে, সেটা হয়তো তিনি কোনো দিনও জানবেন না। অথচ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বেলা হয়ে গেছে অনেক বেশি। মিশা সওদাগর বলেছেন ‘এ অ্যাওয়ার্ডের মূল্য কতটুকু, আমি জানি না।’ আমার খুব আদর করে বলতে ইচ্ছা করে; মায়ের পেটের ভাই আমার, সত্যি করুণা করেই বলছি— যা সম্পর্কে আপনার ধারণাই নেই, সেখানে আপনার উপস্থিতি কেন? কেন নিজেদের এত সস্তা করে ফেলেন? আমরা নতুনরা তো প্রশ্নবিদ্ধে জড়িয়ে যাই। মেহের আফরোজ শাওন তার ব্যক্তিগত বিষয় তুলে এনেছেন এই বলে যে, জাহিদ হাসান তার জীবনে ছিলেন এক ব্রিজের মতো বাহন। আমি অবাক হয়ে যাই। নতুন করে আর এসব জনসমক্ষে বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা সবাই জানি, কতটুকু অধিকার নিয়ে আমাদের মাঝে আপনি বিচরণ করেন। নতুন করে আর কিছু বলার নেই। দয়া করে, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতেন। সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছি— সুবর্ণা মুস্তাফার মতো একজন গুণী শিল্পী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ইস! বিষয়টা এমন যেন, ‘আমার মাথা ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমাকে পদ্ম ফুলের বিল দেখাতে নিয়ে যাবে।’ আমি নিশ্চিত, যখন তিনি ঘরে ফিরছিলেন, তখন অনেক রাতে হাইওয়ের জানালা খুলে দিয়ে ঠাণ্ডায় কপালের ঘাম মুছছিলেন। নরকেও মানুষ মনে হয় বরফে গলে, আর কারো কারো চোখের জলে এ পৃথিবীর এখন আর কোনো কিছুই আসে-যায় না। অযথা ভাঁড় সাজু খাদেম যখন জোর করে বলছিলেন, আমরা সুবর্ণা মুস্তাফার অনুভূতির কথা পরে শুনব, আর তার মাথা ফিরে স্টেজের পেছনে চলে গেল। এ যাত্রা দেখে আমি এত কষ্ট পেয়েছি যে, তা বলে বোঝাতে পারব না। এটা নিতান্তই অপমান।
অন্যদিকে আকবর হোসেন পাঠান ফারুক এবং তিশা যে আসেননি, তাতে একটু স্বস্তি থাকুক বুকের ভেতর। তাই আপনাদের সম্মান করে স্পষ্ট ভাষায় বলছি, এর পর থেকে রিসার্চের মাত্রাটা আরেকটু বাড়িয়ে দিন। শামুকেই যদি পা কাটবেন, সেটা সমুদ্রে হোক, কাদামাটির জলাশয়ে কেন হবে? হাতে সামান্য কিছু টাকার জন্য কলঙ্কিত করবেন না সারা জীবনের দীর্ঘ অর্জন। শিল্পীদের অবশ্যই সীমাবদ্ধতা আছে। অস্তিত্বের জন্যই থাকা উচিত।
এ অনুষ্ঠানে আসা বাকি শিল্পীদের আমি অতিথি শিল্পী বললাম এজন্য যে, তারা কনফিউজড। এতটাই কনফিউজড যে, জানছেনই না কোনটা গ্রহণ করবেন আর কোনটা ছেড়ে দেবেন। তারা আসলে জানেনই না কীভাবে শিল্পীর কাতারে একটা সত্তাকে একটা বিশাল ভ্রমণের মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতে হয়। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই জলে ভেসে যাচ্ছে এসব। তার জ্বলন্ত উদাহরণ স্বয়ং এক উপস্থাপকই। কী করছে না করছে, তার কোনো আগাগোড়া নেই। নেই সূচনা, নেই উপসংহার। টাকাই যদি জীবনের মুখ্য বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে সেটা উপার্জন করার অনেকগুলো প্রথাগত উপায় আছে। শাকসবজি উৎপাদন, গরু-ছাগল পালন করেও টাকা উপার্জন করা যায়। শুধু শুধু ডায়াসে উঠে পিটি খেলার কোনো প্রয়োজন হয় না। ডায়াস সবার জন্য নয়। কারণ কয়েক বছর থেকেই দেখে আসছি—এ রকম অনেক শিল্পীই আসে, আবার হারিয়েও যায় খুব সহজে; শীতের পাখির মতো।
সানি লিওনি প্রসঙ্গতেই বৃহৎ আপত্তি। ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডের সঙ্গে তার কী সম্পৃক্ততা—আমার মাথায়ই ধরে না। গত কয়েক বছরে বাংলা সিনেমায় অযথা আইটেম গান নামক যে বিষয়টা যুক্ত হয়েছে, আমার কাছে মনে হয়েছে, এ উপস্থাপন এক ধরনের মঞ্চ সংস্করণ। তার প্রমাণ হচ্ছে, নিউইয়র্কে অবস্থিত বাংলা টাইম টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাত্কারে এ অনুষ্ঠানের কর্ণধার আলমগীর খান আলম অনুষ্ঠান সঞ্চালককে বলেছিলেন, ‘এটা দর্শকদের জন্য বাড়তি এক ধরনের বিনোদন। তিনি ‘লায়লা ম্যায় লায়লা’ গানটা করবেন এবং তারপর চলে যাবেন। অ্যাওয়ার্ড আদান-প্রদানের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ অথচ অনুষ্ঠানে তার হাত দিয়েই সবচেয়ে বেশি অ্যাওয়ার্ড আদান-প্রদান হয়েছে। ‘লায়লা’ গানের মধ্য দিয়ে সানি লিওন যে ‘কয়লা’ প্রবাসী বাঙালির মুখে মাখিয়ে দিয়ে গেলেন, তার উপযুক্ত উদাহরণ হচ্ছে আজ বাংলা সংস্কৃতির বিশাল এক অংশ সিনেমা, নাটক, গানের অধঃপতনের চূড়ান্ত অস্ত্রের স্থলন। নিজের শিকড়ে শান দেয়া মরা কুড়ালের থাবা। মানেটা হচ্ছে, এক ধরনের ব্লেন্ডেড জুস আপনাকে দেয়া হচ্ছে, যার মধ্যে সব ধরনের ভালো-মন্দ উপাদান থাকবে। আপনি এখন গিলতেই থাকেন। আমার ঘোর আপত্তি এখানেই। কেন এ ব্লেন্ডারে আমার শিল্পীরা। তাছাড়া ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড কোনো সার্টিফায়েড অনুষ্ঠান নয় যে, বাংলাদেশ থেকে তাদের এখানে আসতে হবে। এছাড়া বাস্তবিকভাবে বাংলাদেশের সিনেমা কিংবা অডিও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে এর কোনো ধরনের যোগসাজশ সত্যিকার অর্থেই নেই। টাইম টেলিভিশনে দেয়া সে সাক্ষাত্কারে আলমগীর খান আলম এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমাদের নিজস্ব একটা বোর্ড আছে’। উপস্থাপকের প্রশ্ন ছিল—তারা কারা? সে উত্তর আলম যথাযথভাবে দিতে পারেননি। তাই শিল্পীর মনে রাখতে হবে, আমার অর্জিত একুশে পদক আর জাতীয় পুরস্কার থাকার পর আমার পরবর্তী ধাপ আসলে হবে কোথায়? অনার্স ফার্স্ট ক্লাস নেয়ার পর, আমি যাব উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করতে। তারপর তা বিলিয়ে দেব আগন্তুকের কাছে। সে শিক্ষা আগন্তুক গ্রহণ করে নতুন উদ্যমে শুরু করবে—শিকড়ের সন্ধানকে আরো কীভাবে মজবুত করা যায়। কারণ কোনোভাবেই পরিণত শিল্পীর আর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার অবকাশ নেই।
শিল্পী কখনো ব্যবসা করার হাতিয়ার হতে পারেন না। কারণ আলমের এ ব্যবসার বলি হচ্ছে যাদেরকে আমি অতিথি শিল্পী বলে মনে করছি, তাদের এ অনুষ্ঠানে যোগদান করাকে ঘিরে। বিশেষ করে নারী শিল্পীরা। তাদের কেমন করে যেন একটি লুকানো ইচ্ছা থাকে, যদি এর মধ্য দিয়ে আমেরিকায় থেকে যেতে পারি। তাই সাপের মতো ফণা তুলে থাকা কিছু ব্যবসায়ীও ওত পেতে থাকে কীভাবে আড়ালে থেকেই তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে স্থায়িত্ব দিতে পারবে সাময়িক বাস্তবতায়। ফলে এসব অতিথি শিল্পীর যদি বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকে, সেগুলো সময়ের পরিক্রমায় ধূলিতে পরিণত হয়। তাদের আর কিছুই দেয়ার থাকে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সহজ কথা সহজ করে যদি বলা যায়, তাহলে সারসংক্ষেপটা এ রকম দাঁড়ায়—‘কমিউনিটির বড় বড় ৭০টি প্রতিষ্ঠান থেকে স্পন্সর নিয়েছেন আলম (সূত্র: প্রথম আলো)। ধরলাম, গড়প্রতি স্পন্সর ১ হাজার ডলার করে হলেও ৭০ হাজার ডলার। নিউইয়র্কের জ্যামাইকা এলাকার আমাজুরা হলে ৮৫০ আসন রয়েছে। সব টিকিট বিক্রি শেষ। গড়ে ৫০ ডলার করে টিকিট হলেও ৪২ হাজার ৫০০ ডলার। ধরলাম ৫০ হাজার ডলার। সব মিলিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ডলারের একটি অনুষ্ঠান। এতজন শিল্পী এবং অতিথির থাকা-খাওয়া, শিল্পীদের আনা-নেয়া বাংলাদেশ ও ভারত থেকে, তাদের সম্মানী ও হল ভাড়া। বাড়তি আরো কী পরিমাণ টাকা লাগতে পারে, সেটা অনুমান করলেই পাওয়া যায়। এজন্য আপনাকে আমাকে গণিতবিদ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলো কোত্থেকে আসে? সাপের মতো ফণা তুলে থাকা লুকিয়ে যে মানুষগুলো পেছনে থাকে, তারাই এর জোগানদাতা। আর বলির পাঠার মতো অতিথি শিল্পীদের জীবনবোধের বিসর্জন। এ জায়গায় আমার আপত্তি নেই। এগুলো চলতেই থাকবে। বাই ডিফল্ট। আমার আপত্তি আমার প্রাণের শিল্পীরা কেন এ জায়গায়? ভীষণ ব্যথিত হই, যখন দেখি আমার শিল্পীরা অনুষ্ঠানের অফিশিয়াল পোস্টারে যত্রতত্রভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। অন্যদিকে এ অনুষ্ঠানের কর্ণধার বলেছেন, ‘আগামী বছর থেকে নিয়মিত শো হবে দুবাইয়ে (সূত্র: সময় সংবাদ)। তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গা থেকে তিনি সেটা করতেই পারেন, সেখানে অতিথি শিল্পীদের জীবন বিসর্জন হোক, তাতে আমার কিছুই যায়-আসে না। কিন্তু যারা নিজেদের শিল্পী মনে করেন বা আমরা ধরেই নিই তারা নিজেদের নিয়ে গেছেন সীমানার বাইরে, যাদের ওপর আমাদের আস্থা অনেকাংশে বেশি, তারা যেন এ গোলকধাঁধায় নিজেদের ভাসিয়ে না দেন।
স্পন্সরদের জন্য আমার খুব কষ্ট হয়, স্টেজের পেছনে শিল্পী কপালে হাত দিয়ে বসে থাকেন আর তারা সানি লিওনির সঙ্গে তাদের সব দাঁতগুলো বের করে হাত বাড়িয়ে সস্তা পুরস্কার নিতে ব্যস্ত। চোখে আর মুখে দৃশ্যমান কী যেন তারা খুঁজতে ব্যস্ত? আমার কষ্ট এখানেই, আমার শিল্পীরা হারিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অপব্যবহার করা হচ্ছে। এ দোষ আমি ব্যবস্থাপক কিংবা স্পন্সরদের কোনোভাবেই দেব না। বরং আমি অধিকার নিয়ে আমার শিল্পীদের স্মরণ করিয়ে দেব, দয়া করে রিসার্চটা আরেকটু বাড়িয়ে দিন। আপনাদের অস্তিত্ব সংকট মানে একটা দেশের পুরো সংস্কৃতি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। তার জ্বলন্ত উদাহরণ আজ আমাদের নাটক, গান, চলচ্চিত্র—কোন দিকে যাবে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করছে। নির্দিষ্ট ঠিকানা না থাকার কারণে গন্তব্যে যেতে এ পথ শেষ হচ্ছে না। মানে কোথাও আমরা ভালো কিছু করতে পারছি না। অথচ রূপকথার গল্পের মতো দারুণ শক্ত একটা ইতিহাস আছে আমাদের সংস্কৃতিতে। আর সমস্যাটা হচ্ছে— বিশেষ করে আমরা যারা আগন্তুক, নতুন, যারা সত্যিকার অর্থে দেশের জন্য ভালো কাজ করতে চাই, কিংবা কঠিন সংকল্পবোধ ধারণ করি বুকের ভেতর, নিজের সংস্কৃতিকে নিয়ে যেতে চাই পরবর্তী আরেক উচ্চ ধাপে— তারা প্রচণ্ড রকমের দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি।
শেষটা করব ক্ষমা চেয়ে। এ লেখা আমার লেখার কথা না। এটা আমার কাজ না। আমার কাজ হচ্ছে আমার চিত্রগল্পের চরিত্র এবার কোন দিকে মোড় নেবে! কিন্তু ক্ষমা আমাকে চাইতেই হবে। এখানে যাদের আমার ভাবনায় শিল্পী বলে বুকের ভেতর লালন করি, তাদের অনেকের সঙ্গেই আমার সরাসরি যোগাযোগ আছে। কথা হয়, আলোচনা হয়। তারা যেন কোনোভাবেই এ লেখাকে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ না করে। আমি শুধু আপনাদের ভালোবেসে স্মরণ করিয়ে দিলাম—নিজ স্বার্থেই আপনাদের আসলে কোনদিকে, কীভাবে, কী করে, কোন পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আমার মতো যারা আপনাদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করে এবং যে আস্থা তৈরি হয়েছে দীর্ঘকাল ধরে, তাতে ফাটল ধরাবেন না। ঢেঁকির চালের পিঠার সঙ্গে বিস্তর ব্যবধান বরং নাই-ই হোক। সেই স্বাদ সাধ্যের মধ্যেই থাকুক। যে বীজে নতুন গাছ প্রাণ পাবে, বেড়ে উঠবে আপন শক্তিতে, আপন স্রোতে, সেখানে এ অনুষ্ঠানের মতো যাকে ক্যান্সার সেল বলে মনে হয়, সে যেন ভিড় করতে না পারে। আর তা আমাদের সুস্থ থাকা অবস্থাতেই সজাগ থাকা উচিত। অযথা অধিক ফলনের আশায় আগামী প্রজন্মের কাছে একটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সংস্কৃতির বাহন আমরা তুলে না দিই। সংস্কৃতি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকুক আর আমরা তাকে আরো সমৃদ্ধ করি আপন শক্তিতে। বেঁচে থাকার উপকরণগুলো হোক নির্ভেজাল। নিজের সন্তানকে বড় করে তুলতে শিখি নিজের আত্মপরিচয়ে। ধার করা কোনো পচা জৈব সার আমাদের প্রয়োজন নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বিশাল এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আছে আমাদের নাটকে, গানে, চলচ্চিত্রে। এ অস্তিত্বে আত্মপরিচয়কেই স্বাগত জানাই, সংকটগুলোকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে।
লেখক: স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা
(bonikbarta)

অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

0 Comments

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন ??

দৈনিক জনতা বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম