নির্বাচন কমিশন গঠন: আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ | Formation of Election Commission: Possibility of enactment of law is slim


নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। এ যাবত রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সংলাপের আমন্ত্রণ পাওয়া ৯টি রাজনৈতিক দলই ভাবছে 'বিতর্কমুক্ত' নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি আইন দরকার।

ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া ২টি দলই এ ধরনের আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই বসবেন। যে ২টি দলের সঙ্গে তিনি ইতোমধ্যে কথা বলেছেন, সেগুলো ছাড়া আরও ৭টি দলকে তিনি এ মাসের ২৯ তারিখ পর্যন্ত সংলাপে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

৭টি দলের শীর্ষ নেতারা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তারা রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেবেন।

৭টি দলের মধ্যে ৩টি দল জানিয়েছে, যেহেতু আগামী নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের জন্য গঠিত হতে যাওয়া সার্চ কমিটির সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে কয়েকজনের নাম প্রস্তাব করবেন। 

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেয়। এই ২টি দল আলাদা আলাদা করে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বুধবার ও সোমবার সংলাপে অংশ নেয়।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে জাতীয় সংসদের পক্ষে এ ধরনের আইন প্রণয়ন করা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রপতিকে এ বিষয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করার প্রস্তাবও দিয়েছে জাতীয় পার্টি। উল্লেখ্য, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে পরিচালিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি।

রাষ্ট্রপতি ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন ও খেলাফত মজলিশ, ২৮ ডিসেম্বর ওয়ার্কার্স পার্টি এবং ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ও ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে সংলাপে বসবেন।

দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এখনো সংলাপে যোগদান প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। দলটির মূল দাবি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। 

যদিও দলটি বঙ্গভবন থেকে এখনও সংলাপে যোগ দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায়নি, তবুও এই বিষয়টি নিয়ে আগামী শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলাপ করা হবে।

দলের সূত্ররা জানিয়েছেন, আমন্ত্রণ পেলেও বিএনপি সংলাপ থেকে দূরে থাকতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'চলমান সংলাপের কোনো মানে নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে সে সরকার নির্বাচন কমিশন বিষয়ে সংলাপের আয়োজন করবে।'

বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেওয়া নিয়ে কোনো আইন নেই। তিনি বলেন, 'নির্বাচন কমিশনকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য আইনের প্রয়োজন। আমরা আইন প্রণয়নের পক্ষে কথা বলবো।'

তিনি জানান, বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরীকে তাদের দলের সুপারিশ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিক জানান, তাদের দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেবে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি ফ্রন্টের জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রধান এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'আমরা আইন প্রণয়নের গুরুত্বের ওপর জোর দেব এবং রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এ ধরনের আইনের বাস্তবায়ন করার জন্য অনুরোধ জানাবো।'

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান জানান, তারা দলীয় ফোরামে এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে আলোচনা করে সংলাপে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন।

তিনি জানান, তার দল সংলাপে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তারা রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইনের প্রচলন করার অনুরোধ জানাবেন।

তিনি বলেন, 'এই আইনের প্রচলন হওয়া জরুরি, কারণ সংবিধানে এ বিষয়ে বলা হয়েছে। সংবিধানে সার্চ কমিটি বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। সুতরাং একে আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য একটি আইনের প্রয়োজন আছে।'

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ জানান, তারা রাষ্ট্রপতির কাছে আইন প্রণয়নের বিষয়টি উত্থাপন করবেন, কারণ এ বিষয়টির একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। 'একটি বিশ্বস্ত, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন', যোগ করেন তিনি।

ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদক ইসমাইল হোসেন জানান, তারা নির্বাচন কমিশন গঠনের বিতর্ক শেষ করার জন্য একটি আইন প্রচলনের প্রস্তাব দেবেন।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের জানান, অবশ্যই এই আইনের বাস্তবায়নের বিষয়টি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপের আলোচ্যসূচিতে থাকবে। 'নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের আগে বিতর্কের অবসান ঘটানো উচিত', যোগ করেন তিনি।

ওয়ার্কার্স পার্টি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট জানিয়েছে, তারা সার্চ কমিটির সদস্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য কিছু মানুষের নাম প্রস্তাব করবে।

সংবিধানের ১১৮(১) নং ধারায় বলা হয়েছে 'প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া এবং রাষ্ট্রপতি সময়ে সময়ে যেরূপ নির্দেশ করিবেন, সেইরূপ সংখ্যক অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ করিবেন।'

তবে এ যাবত কোনো সরকারই এ ধরনের কোনো আইন প্রণয়ন করেনি। তবে দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে এ ধরনের আইন চালু আছে।

জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র ২ বছর বাকি থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনে ভোটারদের অনুপস্থিতি ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি অবিশ্বাসের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। যে কারণে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টি সবার নজরে এসেছে।

বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সদস্যরা এবং বিভিন্ন প্রথম সারির নাগরিক গত কয়েক মাস ধরে এই আইন বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। 

এই আইনটি প্রণয়ন করতে সরকারকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে নাগরিক সমাজের প্ল্যাটফর্ম সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) গত মাসে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন-২০২১' শিরোনামের একটি খসড়া আইন হস্তান্তর করেছে। 

খসড়ায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতি একটি ৭ সদস্যের সার্চ কমিটি তৈরি করবেন। 

৭ সদস্যের মধ্যে থাকবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, সংসদ নেতার মনোনীত একজন সংসদ সদস্য, বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত একজন সংসদ সদস্য, জাতীয় সংসদের তৃতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের মনোনীত একজন সংসদ সদস্য, বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), নাগরিক সমাজের একজন সদস্য ও গণমাধ্যমের একজন প্রতিনিধি।

এর আগে, কাজী রাকিব উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন ২০১১ সালে একটি খসড়া আইন তৈরি করে সেটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে জমা দিয়েছিল।

তবে সে আইনটি বাস্তবায়ন করা হয়নি।

আইনমন্ত্রী গত ২৮ নভেম্বরে সংসদে জানান, বর্তমান জাতীয় সংসদের পরবর্তী অথবা আরও পরের কোনো অধিবেশনে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন নিয়ে একটি বিল উত্থাপন করা হতে পারে

২০১২ ও ২০১৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারদের নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গত সোমবার একটি বিবৃতিতে জানান, 'এর আগে সংলাপ আয়োজনের পর সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু তাতে প্রত্যাশিত ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়নি। সুতরাং, একটি নিরপেক্ষ, সৎ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য শিগগির আইনের প্রয়োজন।'

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Holy Foods ads

Holy Foods ads

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget