রাশিয়া রণাঙ্গণে তাদের মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না- তাই আমরা গুনছি

0
145
মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না

মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না :ঐতিহাসিকভাবেই রাশিয়া সবসময় যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে খুবই গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করে। সুতরাং রাশিয়া যখন ইউক্রেনে হামলা শুরু করে তখন থেকেই বিবিসি এবং সহযোগীরা এই যুদ্ধে মৃত্যুর সংখ্যা যাচাই করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে চলেছে।

আমাদের তৈরি নিশ্চিত মৃত্যুর তালিকায় মৃতের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বলা যায়, রাশিয়ার দিকে নিহতের সংখ্যা এর নিচে কোনোভাবেই হয়নি। কারণ নিহতদের নাম-ধামও জানা গেছে।

রুশ বাহিনীর ওপর এই যুদ্ধের পরিণতি কী হয়েছে মৃত্যুর এই সংখ্যা তার একটি সাক্ষাৎ প্রমাণ।

এই তালিকা অন্ধকারে থাকা শোকগ্রস্ত রুশ পরিবারগুলোকেও কিছু আলো দেখিয়েছে। মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না এই অনুসন্ধানের আগে অনেক রুশ বাবা-মাই জানতেন না তাদের সন্তানের ভাগ্যে কী ঘটেছে।

দুই রুশ যোদ্ধার কাহিনী মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না

রুশ সেনাদের সমাধি

রুশ স্পেশাল ফোর্সেসের একজন গ্রুপ লিডার সার্জেন্ট নিকিতা লোবুরেতজ, গত বছর মে মাসে পূর্ব ইউক্রেনের একটি গ্রামে নিহত হন। তার বয়স ছিল ২১।

তার প্রায় এক বছর পর বাখমুটের কাছে লড়াইয়ে আলেক্সান্ডার জুবাকভের মৃত্যুর কথা জানতে পারেন তার আত্মীয়-স্বজন। ৩৪ বছরের জুবাকভ মাদকের মামলায় সাজা খাটছিলেন। জেল থেকে মুক্তির আশায় তিনি ওয়াগনার ভাড়াটে বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।

বিবিসি এবং নিরপেক্ষ রুশ মিডিয়া সংস্থা মিডিয়াজোনা এবং সেইসাথে আরো কিছু স্বেচ্ছাসেবী মিলে যে ২৫ হাজার নিহতের তালিকা তৈরি করেছে এরা তাদের দুজন মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না । সরকারি রিপোর্ট, সোশাল মিডিয়া, সংবাদপত্র এবং নতুন কবর এবং কবরের ওপর লাগানো ফলকের ভিত্তিতেই প্রধানত এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

ইউক্রেনে হামলার পর রুশ সেনাবাহিনী কীভাবে বদলে গেছে এই দুই ব্যক্তি তার একটি নমুনা। রণাঙ্গনে এখন যারা যুদ্ধ করছে তাদের অনেকেই বয়স্ক, তাদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণ নেই। ফলে, হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।

কিন্তু যুদ্ধের শুরুর দিকে যেসব রুশ যোদ্ধার নিহত হওয়ার খবর বিবিসি পেয়েছে তাদের গড় বয়স ছিল ২১। নীচের র‍্যাংকের, কিন্তু পেশাদার সৈন্য- যেমন, সার্জেন্ট নিকিতা লোবুরেতজ।

তার বাবা কনস্তান্তিনের ভাষ্যমতে, লোবুরেতজ একজন প্যারাট্রুপার বা ছত্রীসেনা হতে চেয়েছিলেন। সীমান্ত থেকে ৬০ মাইল দূরের শহর ব্রিয়ানস্কে স্কুলে পড়ার সময়ই তার এই স্বপ্ন ছিল। ফলে তখন থেকেই তিনি মার্শাল আর্ট এবং প্যারাসুট জাম্পিং শিখতে শুরু করেছিলেন।

পরে লোবুরেতজ রুশ প্যারাট্রুপারদের এলিট প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমি রিয়াজান হায়ার এয়ারবোর্ন স্কুলে সুযোগ পান মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না। সেখান থেকে বেরিয়ে যোগ দেন রুশ সেনা গোয়েন্দা বাহিনী জিআরইউ-এর স্পেশাল ফোর্সেস ব্রিগেডে।

যুদ্ধ শুরুর মাস তিনেক পর সার্জেন্ট লোবুরেতজ এবং তার ব্রিগেড খারকিভ শহরে উত্তরে একটি গ্রামে অতর্কিত হামলার শিকার হয়। সেখানেই তিনি মারা যান বলে জানান তার বাবা।

তার শহরের কবরস্থানে তার কবর হয়েছে। তাকে মরণোত্তর অর্ডার অব কারেজ খেতাব দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এক বছর পর রুশ বাহিনীতে এ বয়সের সৈনিকের মৃত্যু তেমন দেখা যাচ্ছেনা।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যেসব রুশ সৈন্য মারা যাচ্ছে তারা মাঝবয়েসী দাগী আসামী যাদের কারাগার থেকে নিয়োগ করে রণক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।

যুদ্ধে নিহতদের বয়সের তুলনামুলক ছবি। প্রথম তিন মাসে নিহত হয়েছে মূলত তরুণ পেশারদার সৈন্য (বামে)। শেষ তিনমাসে নিহতদের অধিকাংশই মাঝবয়সী যাদের কারাগার থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে
যুদ্ধে নিহতদের বয়সের তুলনামুলক ছবি। প্রথম তিন মাসে নিহত হয়েছে মূলত তরুণ পেশারদার সৈন্য (বামে)। শেষ তিনমাসে নিহতদের অধিকাংশই মাঝবয়সী যাদের কারাগার থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে

আলেকজান্ডার জুবাকভের মত।

আলেকজান্ডার জুবকভ

ওয়াগনার ভাড়াটে বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করা জুবকভের কোনো সামরিক র‍্যাংক ছিলনা। তার জন্ম রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিমের উপকূলীয় শহর সেভেরোভিনস্কে যেখানে রুশ নৌবাহিনীর বড় একটি শিপইয়ার্ড রয়েছে।

আদালতের রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায় হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০১৪ সালে তার যখন সাড়ে আট বছরের কারাদণ্ড হয় জুবাকভ ছিলেন বেকার। এক বাচ্চার বাবা।

২০২০ সালে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে পরের বছরেই তিনি মাদকের মামলায় পড়ে যান। ৬০০ গ্রাম অবৈধ সিনথেটিক মাদক পিভিপি সহ তাকে ধরা হয়।

আদালত তাকে আরো নয় বছরের কারাদণ্ড দেয়। এই সাজা কিছুটা লঘু ছিল, এবং আদালত তার কারণ মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না হিসাবে বলে বিবাহ বিচ্ছেদ হলেও তার ছোট একটি বাচ্চা রয়েছে এবং সেইসাথে বিকলাঙ্গ এক বোনকে তিনি দেখাশোনা করতেন।

ওয়াগনার গোষ্ঠী কারাগার থেকে যোদ্ধা নিয়োগ শুরু করলে, গত বছর নভেম্বরে জুবাকভ তাতে যোগ দেন। তাকে মাসে এক লাখ রুবল (১০০০ ডলার) বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ছয় মাস যুদ্ধের পর তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

কিন্তু পাঁচ মাসের মাথায় বাখমুট শহর দখলের যুদ্ধে জুবাকভ মারা যান। তার নিজের শহরে ২৮ এপ্রিল তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

যে সৈন্যরা খরচের খাতায়
জুবাকভ এবং তার মত যোদ্ধাদের এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে যেন তারা “ডিসপোজেবল ট্রুপস” অর্থাৎ তাদেরকে সহজে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যায়- বলছেন লন্ডনে গবেষণা সংস্থা রুসির ড. জ্যাক ওয়াটলিং।

আমাদের জোগাড় করা নিহতের তালিকায় আমরা দেখেছি তাদের মধ্যে ছিচকে চোর থেকে শুরু করে গ্যাং লিডার পর্যন্ত রয়েছে।

নিহত এক যোদ্ধার খবর নিয়ে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধ করা ৯২ বছরের এক বৃদ্ধ সৈনিককে হত্যার দায়ে তার কারাদণ্ড হয়েছিল।

জানা গেছে, এদের ওপর নির্দেশ রয়েছে দলে দলে রণাঙ্গনে ইউক্রেন সৈন্যদের অবস্থানে গিয়ে একের পর এক হামলা করার।

“এদেরকে রণক্ষেত্রের একেবারে সম্মুখভাগে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে এবং ধরে নেয়া হচ্ছে লড়াই করতে করতে এরা মারা যাবে,” বলেন ড. ওয়াটলিং। “এবং সেই সুযোগে যাতে পরপরই রুশ সেনাবাহিনী দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।“

নিহতের পরিসংখ্যানেই এই কৌশল টের পাওয়া যায়।

যুদ্ধের প্রথম তিন মাসে রাশিয়া অনেক পেশাদার সৈন্য হারিয়েছে।

কিন্ত গত তিনমাসে, নিহতদের অধিকাংশই অপেশাদার যোদ্ধা।

প্রথম তিনমাস ও শেষ তিনমাসের মৃত্যুর তুলনামূলক চিত্র
ছবির ক্যাপশান,
প্রথম তিনমাস ও শেষ তিনমাসের মৃত্যুর তুলনামূলক চিত্র

ড ওয়াটলিং বলেন, রাশিয়া তাদের পেশাদার সৈনিকদের রক্ষা করছে। তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে মূলত দখল করা এলাকা ধরে রাখা এবং স্নাইপার হিসাবে। তবে সেই সাথে মাঝ মাঝে সুযোগ বুঝে বিশেষ ধরণের হামলা চালাচ্ছে নিয়মিত সৈন্যরা।

রুশ সেনাবাহিনীতে চৌকস সেনা কর্মকর্তার খুব বেশি সরবরাহ এখন নেই। বিবিসি কমপক্ষে ২১০০ রুশ সামরিক কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে। কারণ পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় রুশ সেনাবাহিনী সম্মুখ যুদ্ধে জুনিয়র কর্মকর্তাদের ওপর অপেক্ষাকৃত বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল। ফলে তারা ঝুঁকিতে পড়ে। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ২৪২ জন লে.কর্নেল বা তার ওপরের মর্যাদার সেনা কর্মকর্তা।

কমপক্ষে ১৫৯ জন পাইলট মারা গেছে। এদের জায়গা পূরণ সহজ নয়। তার জন্য দরকার কমপক্ষে সাত বছর এবং প্রচুর অর্থ।

এর ফলে অনেক সেনা কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার পরও সেনাবাহিনীতে ফিরে আসছেন। যেমন: মেজর জেনারেল কানামাত বোতাশেভ।

অনুমতি ছাড়া একটি এসইউ-২৭ বিমান চালানোর সময় সেটি বিধ্বস্ত হলে তাকে মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না ২০১২ সালে জোর করে অবসরে পাঠানো হয়। কিন্তু গত বছর মে মাসে তিনি একটি এসইউ-২৫ বিমান চালাচ্ছিলেন যখন পূর্ব ইউক্রেনের লুহানস্কে তার বিমানটি গুলি করে নামানো হয়, এবং তিনি মারা যান।

তার চেয়েও বেশি বয়সী লোক যুদ্ধ করতে গিয়ে গেছেন। মিখাইল শুবালভ নামে ৭১ বছর বয়সের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিদ্যুৎ শ্রমিক স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করতে গিয়ে ১০ ডিসেম্বর মারা যান।

বিবিসির রুশ ভাষা বিভাগের সাংবাদিকরা এই গণনা শুরু করেন কারণ তারা মনে করেছিলেন এ ছাড়া কখনই হয়তো প্রাণহানির সঠিক চিত্র পাওয়া যাবেনা।

যুদ্ধে দুই পক্ষই তাদের ক্ষতি কমিয়ে দেখায়। ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া যুদ্ধে তাদের মৃত্যুর কথা চেপে রাখতে সবরকমের চেষ্টা করেছে।

চেচেন এবং আফগান যুদ্ধ শেষ হয়েছে বহুদিন আগে। এখনও নিহতের সত্যিকারের রেকর্ড পাওয়া দুষ্কর।

এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার প্রাণহানির কথাও পুরোপুরি জানা যায়না।

মিডিয়াজোনা এবং রুশ স্বেচ্ছাসেবীরা স্বতঃ:প্রণোদিত হয়ে যেসব তথ্য পাঠিয়েছেন বিবিসি সেগুলো হিসাব করেছে। সেইসাথে সরকারি কর্মকর্তাদের কথা, মিডিয়া রিপোর্ট এবং স্বজন এবং সোশাল মিডিয়ার তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবীরা সারাদেশের যুদ্ধে নিহতদের সমাধিস্থলগুলো ঘুরে নতুন কবর এবং নাম খুঁজে বের করেন। সেগুলোর ছবি তোলেন।

এসময় ওয়াগানারের যোদ্ধাদের সমাহিত করতে সাতটি নতুন সমাধিস্থলের – ছয়টি রাশিয়ায় এবং একটি পূর্ব ইউক্রেনের লুহানস্কে – খোঁজ পান তারা। স্যাটেলাইটের ছবি থেকে দেখা গেছে দক্ষিণ রাশিয়ার বাকিন্সকায়ায় তেমন একটি নতুন সমাধিস্থল গত কয়েকমাস ধরে ক্রমাগত আয়তনে বাড়ছে।

বাকিনসকায়ায় একটি সমাধিস্থলের আয়তন বেড়েই চলেছে
ছবির ক্যাপশান,
বাকিনসকায়ায় একটি সমাধিস্থলের আয়তন বেড়েই চলেছে

রাশিয়ার সরকার তাদের পক্ষে নিহতের সর্বশেষ যে হিসাব দিয়েছে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে সে অনুযায়ী নিহত হয়েছে ৫ হাজার ৯৩৭ জন সৈন্য।

কিন্তু সে সময়েই বিবিসির হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৬ হাজার ৬০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এখন তা ২৫ হাজারেরও বেশি।

ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হিসাব দেয় ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার রুশ সৈন্য মারা গেছে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হিসাব দেয় দুই লাখেরও বেশি, তবে তার মধ্যে আহতরাও রয়েছে।

ফলে রাশিয়ার দেয়া সংখ্যার তুলনায় বাকিদের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি।মৃত সৈনিকদের হিসাব রাখছে না |

রুশ সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়েছিল বিবিসি, কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি।

রাশিয়ার পক্ষে নিহতদের সবার কথা বিবিসির পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। গোপন নয় এমন সব সূত্রে পাওয়া খবর এবং স্বেচ্ছাসেবীরা যেসব সমাধি ঘুরে দেখেছেন তার ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ডনবাসে রুশ ভাষাভাষী বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলিশিয়াদের হতাহতের খবরও এই তালিকায় নেই।

অনেক রুশ পরিবার এই তালিকা থেকে তাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়েছে।